ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক রূপান্তরের ইতিহাস। ১৮৫৪ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কীভাবে ভারতীয় শিক্ষা এক স্তর থেকে অন্য স্তরে উন্নীত হয়েছে, তার একটি সুসংবদ্ধ ও গল্পের মতো ধারাবাহিক বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন (১৮৫৪ - ১৮৮২)
ভারতীয় আধুনিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৪ সালের উডস ডেসপ্যাচ-এর মাধ্যমে। স্যার চার্লস উড যখন তাঁর প্রতিবেদন পেশ করেন, তখন ভারতে শিক্ষার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না। তিনি প্রথমবারের মতো প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি পিরামিড সদৃশ কাঠামোর প্রস্তাব দেন। তাঁর সুপারিশেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এই দলিলটি এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে একে ভারতীয় শিক্ষার 'ম্যাগনা কার্টা' বলা হয়। এটি তৎকালীন 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' (শিক্ষার সুবিধা শুধু উচ্চবিত্তের জন্য) বাতিল করে সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
এর প্রায় তিন দশক পর, ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশন গঠিত হয়। লর্ড রিপন বুঝতে পেরেছিলেন যে উচ্চশিক্ষার ডামাডোলে প্রাথমিক শিক্ষা অবহেলিত হচ্ছে। হান্টার কমিশনই প্রথম সুপারিশ করে যে প্রাথমিক শিক্ষা স্থানীয় ভাষায় দিতে হবে এবং এর দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এখান থেকেই শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়।
২. সংস্কার ও গুণগত মানোন্নয়ন (১৯১৭ - ১৯২৯)
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উচ্চশিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার সমাধানে ১৯১৭ সালে আসে স্যাডলার কমিশন। স্যাডলার সাহেব প্রস্তাব দেন যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে মজবুত করতে হলে আগে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ১২ বছরের একটি শক্তিশালী কাঠামোয় আনতে হবে।
কিন্তু দ্রুত শিক্ষা বিস্তারের ফলে শিক্ষার গুণগত মান কমতে শুরু করে এবং প্রচুর ছাত্র ফেল করতে থাকে। ১৯২৯ সালে হার্টগ কমিটি সতর্ক করে দিয়ে বলে যে, শুধু সংখ্যা বাড়ালে চলবে না, শিক্ষার গুণগত মান (Quality) বাড়াতে হবে। তাঁরাই প্রথম বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন যাতে সব ছাত্রকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাওয়ার পেছনে ছুটতে না হয়।
৩. জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (১৯৩৭ - ১৯৪৪)
ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে ভারতীয়দের নিজস্ব চিন্তাধারা ফুটে ওঠে মহাত্মা গান্ধীর ওয়ার্ধা পরিকল্পনা (১৯৩৭) বা বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে। গান্ধীজি মনে করতেন, শিক্ষা হওয়া উচিত জীবনমুখী এবং শ্রমভিত্তিক। তাঁর মতে, শিশুরা হাতের কাজের (যেমন চরকা কাটা বা মাটির কাজ) মাধ্যমে শিখবে, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল করবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৪ সালে স্যার জন সার্জেন্ট একটি ২০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন, যা সার্জেন্ট পরিকল্পনা নামে পরিচিত। এটি ছিল স্বাধীনতার আগে ভারতের জন্য সবচেয়ে আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা, যেখানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার কথাও ভাবা হয়েছিল।
৪. স্বাধীন ভারতের প্রথম পদক্ষেপ (১৯৪৮ - ১৯৫২)
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল ব্রিটিশ কাঠামোর বাইরে ভারতীয় ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটানো। ১৯৪৮ সালে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে গঠিত হয় রাধাকৃষ্ণন কমিশন। এটি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং গবেষণার ওপর জোর দেয় এবং এর সুপারিশেই ১৯৫৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) আত্মপ্রকাশ করে।
এরপর ১৯৫২ সালে মুদালিয়ার কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষার দিকে নজর দেয়। তারা পাঠ্যক্রমে বৈচিত্র্য আনা এবং ছাত্রদের শারীরিক ও নৈতিক গঠনের জন্য স্কাউটিং ও এনসিসি (NCC)-র মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়।
৫. আধুনিক ভারতের আধুনিক শিক্ষানীতি (১৯৬৪ - ১৯৯২)
ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটে ১৯৬৪ সালের কোঠারি কমিশন-এর মাধ্যমে। ড. ডি. এস. কোঠারি সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সুতোয় বাঁধেন। তাঁরই সুপারিশে বর্তমানের পরিচিত ১০+২+৩ কাঠামো তৈরি হয়। এই কমিশনের ওপর ভিত্তি করেই ১৯৬৮ সালে ভারতের প্রথম জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীত হয়, যেখানে মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং 'তিন ভাষার সূত্র' (হিন্দি, ইংরেজি ও আঞ্চলিক ভাষা) বাধ্যতামূলক করা হয়।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধীর আমলে আসে দ্বিতীয় জাতীয় শিক্ষানীতি। এই প্রথম শিক্ষায় কম্পিউটার এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা হয়। অনগ্রসর ও নারীদের শিক্ষার মূল ধারায় আনার জন্য এটি ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ।
পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে রামমূর্তি কমিটি এবং জনার্দন রেড্ডি কমিটি ১৯৮৬-র নীতিটিকে আরও বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। ১৯৯২ সালের সংশোধিত শিক্ষানীতি মূলত আধুনিক প্রযুক্তি এবং সামাজিক সাম্যের ওপর ভিত্তি করে আজকের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার শিক্ষার ভিত গড়ে দিয়েছিল।
উপসংহার: উডস ডেসপ্যাচ যদি শিক্ষার 'বীজ' বপন করে থাকে, তবে কোঠারি কমিশন বা পরবর্তী জাতীয় শিক্ষানীতিগুলো সেই বীজকে একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত করেছে। ১৮৫৪-র 'ম্যাগনা কার্টা' থেকে ১৯৯২-র প্রযুক্তিগত রূপান্তর—এই পুরো পথচলাটি ছিল শিক্ষাকে কেবল 'পড়া' থেকে 'জীবন গড়ার হাতিয়ার'-এ পরিণত করার এক নিরন্তর সংগ্রাম।